রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ০১:৫১ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ॥
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শুরুতেই মেঘ জমতে শুরু করেছে রাজনৈতিক আকাশে। সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বৈত শপথ, গণভোটের বাস্তবায়ন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ- এই তিন স্পর্শকাতর ইস্যুতে এখন মুখোমুখি অবস্থানে সরকার ও বিরোধী দল। ‘জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট’ বনাম ‘বিদ্যমান সংবিধান’- এই দুই মেরুর অবস্থানে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনীতির মাঠ।
অধ্যাদেশ নিয়ে রশি টানাটানি
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ১৩৩টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করা নিয়ে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র মতভেদ। দুই দিনের ম্যারাথন বৈঠকে ১২০টি অধ্যাদেশে ঐকমত্য মিললেও বাকি ১৩টি নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ‘গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫’। ক্ষমতাসীন বিএনপি এই অধ্যাদেশটি বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছে, যাদের যুক্তি হলো- যে রাষ্ট্রপতির আদেশে এটি হয়েছিল তার সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট এর কঠোর বিরোধিতা করে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তাদের মতে, গণভোটের রায় বাতিল করা জনগণের ম্যান্ডেটের অবমাননা।
এ ছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশ কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত।
দ্বৈত শপথের সংকট
সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন বিভক্তি। ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সচিবালয়ে বিএনপি ও তাদের শরিকরা বিদ্যমান সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। অন্যদিকে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারে জামায়াত ও তাদের জোটের সদস্যরা দ্বৈত শপথ নিয়েছেন। এই ভিন্নমুখী অবস্থান ও আইনি ব্যাখ্যা সংসদ অধিবেশনকে যেকোনো সময় উত্তপ্ত করে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকার ও বিরোধীদের অবস্থান
সরকার পক্ষের প্রভাবশালী দুই মন্ত্রী (আইন ও স্বরাষ্ট্র) স্পষ্ট জানিয়েছেন, জুলাই সনদ ও সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। আইনমন্ত্রী বলেন:
“জুলাই সনদ আমাদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ দলিল। এর ৩ নম্বর পৃষ্ঠার ৬-এর ‘ক’ ধারা অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য। আমরা সংবিধান ও সনদকে প্রাধান্য দিয়েই সব পদক্ষেপ নিচ্ছি।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ‘জুলাই সুরক্ষা’ সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশে সবাই একমত হয়েছেন এবং সেগুলো হুবহু সংসদে পেশ করা হবে।
অন্যদিকে, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান বলেন, “টু-থার্ড মেজরিটির দোহাই দিয়ে অতীতের মতো একতরফা সিদ্ধান্ত নিলে জাতি তা মেনে নেবে না। গুম কমিশন বা মানবাধিকার কমিশনের মতো অর্জনগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হলে আমরা রাজপথে নামতে বাধ্য হব।”
আগামী ২৯ মার্চের দিকে তাকিয়ে দেশ
বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন জানিয়েছেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে ২৯ মার্চ রাত সাড়ে ৮টায় পুনরায় বৈঠকে বসবে কমিটি। আগামী ২ এপ্রিলের মধ্যে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সংসদের ভেতরে ও বাইরে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কি আপস হবে, নাকি সংঘাতের পথে হাঁটবে দেশ? সেই উত্তর মিলতে পারে ২৯ মার্চের বৈঠকেই।